Subscribe Us

header ads

চেয়ারে বসে নামায আদায়ের বিধান ও পদ্ধতি। পর্ব ০২

এটিও পড়ুন...চেয়ারে বসে নামায আদায়ের বিধান ও পদ্ধতি। পর্ব ০১

দাড়াতে সক্ষম তবে রুকু -সেজদা করতে অক্ষম এমন ব্যক্তির নামায।   

কোন ব্যক্তি যদি এমন হয় যে, সে জমিনের উপর সিজদা করতে পারেনা তবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতে পারে, তাহলে এমন ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই নামায আদায় করতে হবে। এমতবস্থায় সে যেহেতু সেজদা করতে পারছেনা তাই সে বসে বসে ইশারায় সেজদা করবে। শুধুমাত্র জমিনে সেজদা করতে অপারগ হওয়ার কারণে কিয়াম পরিত্যাগ করা যাবেনা। কারণ নামাযের মধ্যে কিয়াম করা নামাযের একটি স্বতন্ত্র ফরয। আর কিয়াম শুধুমাত্র এমন ব্যক্তির উপর ফরজ হবেনা যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতে পারেনা। সুতরাং শুধুমাত্র সেজদা করতে না পারার কারণে নামাযের ফরয কিয়াম মাফ হবেনা।

আল্লামা ইবনে নুজাইম রহ. এই মতটিকে উত্তম ও সঠিক বলে উল্লেখ করেছেন,

هَذَا أَوْلَى مِنْ قَوْلِ بَعْضِهِمْ صَلَّى قَاعِدًا إذْ يُفْتَرَضُ عَلَيْهِ أَنْ يَقُومَ لِلْقِرَاءَةِ فَإِذَا جَاءَ أَوَانُ الرُّكُوعِ وَالسُّجُودِ أَوْمَأَ قَاعِدًا.

অর্থ: আর এই মতটি (অর্থাৎ রুকু সেজদার জন্য বসে বসে ইশারা করবে) তাদের মতটি থেকে উত্তম যারা বলেন শুরু থেকেই বসে বসে নামায আদায় করবে। কারণ এমন ব্যক্তির জন্য কেরাতের সময়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেরাত পড়া ফরয। আর যখন রুকু সেজদার সময় হয়ে যাবে তখন বসে বসে ইশারায় রুকু সেজদা করবে। (আন-নাহরুর ফায়েক ১/৩৩৬-৩৩৭, কদীমী কুতুবখানা, আল-বাহরুর রায়েক ২/১২৬, দারুল কিতাবিল ইসলামী)     

আল্লামা ত্বহহবী রহ. আল্লামা ইবনে নুজাইম রহ. এর সাথে একমত পোষণ করে ব্যক্ত করেন,

وفي النهر ما يفيد أنه عند العجز عن السجود يفترض عليه أن يقوم للقراءة فإذا جاء أوان الركوع والسجود يقعد ويومىء بهما

অর্থ: আন-নাহরুল ফায়েকের আলোচনা থেকে বোঝা যায়, সেজদা করতে অক্ষম ব্যক্তির জন্য কেরাতের সময় দাঁড়ানো ফরজ। আর রুকু-সেজদার সময় হলে বসে বসে ইশারায় তা আদায় করবে। (হাশিয়াতুত ত্বহতবী আলা মারাকিউল ফালাহ ১/৪৩১ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, মাকতাবায়ে রশীদিয়া)   

আল্লামা ইবনে হুমাম রহ. ও উক্ত মতকে সমর্থন করে উল্লেখ করেছেন,

وَلِمَا فِيهِ نَفْسِهِ مِنْ التَّعْظِيمِ كَمَا يُشَاهَدُ فِي الشَّاهِدِ مِنْ اعْتِبَارِهِ كَذَلِكَ حَتَّى يُحِبَّهُ أَهْلُ التَّجَبُّرِ لِذَلِكَ ، فَإِذَا فَاتَ أَحَدُ التَّعْظِيمَيْنِ صَارَ مَطْلُوبًا بِمَا فِيهِ نَفْسِهِ.

অর্থ: দাঁড়ানো থেকে সেজদায় অবনত হওয়ার মাঝে যেমন সম্মান প্রকাশ করা হয় ঠিক তদ্রুপ শুধু দাড়ানোর মধ্যেও সম্মান প্রকাশ করা হয়। দাড়ানোর দ্বারা যে সম্মান প্রদর্শন করা হয় তা সাক্ষীর ক্ষেত্রে দেখা যায়। একারণেই তো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সম্মানের জন্য তাদের সামনে দাড়ানোকে পছন্দ করে থাকে। আর এখন যেহেতু সেজদার মাধ্যমে যে সম্মান করার কথা ছিল তা ছুটে গেছে, তাই অন্তত কিয়ামের মধ্যে যে সম্মান আছে তা প্রদর্শনের জন্য কিয়ামের বিধানকে ওয়াজিব বলা হবে। (ফাতহুল কাদীর ২/৭ দারুল কুতুবিল ইসলামিয়্যাহ, বৈরুত, ৩/১০৪ শামেলা)

চেয়ারে বসে টেবিলে বা খাটের উপর সেজদা করা  

কোন ব্যক্তি যদি জমিনে সেজদা করতে না পারে, তাহলে সে দাঁড়িয়ে বা বসে যেভাবেই হোক ইশারা করেই সেজদা করবে তার সামনে টেবিল, খাট, বালিশ ইত্যাদি রেখে তার উপর সেজদা করবে না এগুলোর উপর কপাল রাখলেই তাকে সেজদা বলা হয়নাকারণ সেজদা এমন পদ্ধতিকেই বলা হয় যার মধ্যে উভয় হাটু জমিনে থাকে এবং কপালের অংশ কোমরের অংশ থেকে নিচু হয়

হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন,          

عَادَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهَ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرِيضًا ، وَأَنَا مَعَهُ ، فَرَآهُ يُصَلِّي وَيَسْجُدُ عَلَى وِسَادَةٍ ، فَنَهَاهُ وَقَالَ : إِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَسْجُدَ عَلَى الأَرْضِ فَاسْجُدْ ، وَإِلا فَأَوْمِئْ إِيمَاءً ، وَاجْعَلِ السُّجُودَ أَخْفَضَ مِنَ الرُّكُوعِ

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সা. একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলেন, আমিও তার সাথে ছিলাম, রাসুলুল্লাহ সা. তাকে বালিশের উপর সেজদা দিয়ে নামায আদায় করতে দেখলেন। অতপর তিনি তাকে নিষেধ করলেন এবং বললেন, যদি তুমি জমিনে সেজদা করতে পার তাহলে তুমি জমিনেই সেজদা কর। নতুবা তুমি ইশারা করে নামায আদায় কর। তবে এক্ষেত্রে তুমি রুকুর ইশারা থেকে সেজদার ইশারায় একটু বেশি ঝুকবে। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ ২/৩৪৭ )   

কাতারে চেয়ার রাখার সঠিক পদ্ধতি।  

যদি শরঈ কোন ওযরের কারণে মসজিদে জামাতের সাথে চেয়ারে বসেই নামায আদায় করতে হয়, তাহলে কাতারে চেয়ার রাখার পদ্ধতি হলো, চেয়ারের পিছনের পায়া কাতারের দাগ বরাবর রাখবে অর্থাৎ কাতারে দাঁড়ানো মুসল্লিদের পায়ের গোড়ালি বরাবর রাখবে। যাতেকরে চেয়ারে বসা অবস্থায় মাযূর ব্যক্তির কাধ অন্যান্য মুসল্লিদের কাধ বরাবর থাকে।  

আর যদি কোন ব্যক্তি দাড়াতে সক্ষম হওয়ার কারণে পূর্ণ নামায চেয়ারে বসে না আদায় করে কেরাতের সময় দাঁড়িয়ে নামায পড়ে এবং রুকু সেজদা করতে না পারায় চেয়ারে বসে রুকু সেজদা করে, তাহলে এমন ব্যক্তির জন্য কাতারে চেয়ার রাখার পদ্ধতি হলো, চেয়ারের সামনের পায়া কাতারের দাগ বরাবর রাখবে এবং পুরো চেয়ার কাতারের পিছনে থাকবে। যাতেকরে দাঁড়ানো অবস্থায় উক্ত মাযূর কাধ অন্যান্য মুসল্লিদের কাধ বরাবর থাকে। অবশ্য এভাবে চেয়ার রাখলে পিছনের কাতারে যে মুসল্লিরা নামায পড়বে তাদের সমস্যা হবে। এক্ষেত্রে এই সমস্যার সমাধান হলো, এজাতীয় মাযূর ব্যক্তিরা কাতারের এক পার্শ্বে একজনের পিছনে আরেকজন দাঁড়াবে, তাহলে অন্যান্য মুসল্লিদের নামায পড়তে কোন রকমের সমস্যা হবেনা।  

চেয়ারে নামায আদায় করার কিছু ক্ষতিকর দিক।

জমিনে বসে নামায আদায় করার শক্তি থাকা সত্বেও চেয়ারে বসে নামায আদায় করার মাঝে শরঈ কিছু ক্ষতি পরিলক্ষিত হয়। যেমন- চেয়ারে বসে নামায পড়লে পূর্ণমাত্রায় বিনয় ও নম্রতা পাওয়া যায়না। অথচ নামাযের মধ্যে বিনয় ও নম্রতাই হলো প্রধান লক্ষ্য। মসজিদে চেয়ারের আধিক্যতার কারণে তা ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের উপসনালয়ের মত হয়ে যাচ্ছে। কেননা তাঁরা তাদের উপাসনালয়ে চেয়ারে ও বেঞ্চে বসে উপসনা করে থাকে। চেয়ারের আধিক্যতার কারণে মসজিদে অন্যান্য মুসল্লিদের কাতার সোজা করতে সমস্যা হয়ে যায়। অথচ কাতার সোজা করে দাঁড়ানো নামাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শরীয়তে মাযূর নয় অর্থাৎ কিয়াম, রুকু ও সেজদা সবকিছুই করতে সক্ষম যার জন্য জমিনে বসে বা চেয়ারে বসে নামায আদায় করার অনুমতি নেই এমন সুস্থ ব্যক্তিও তার সামনে চেয়ার থাকার কারণে চেয়ারে বসেই নামায আদায় করে। অথচ এভাবে নামায পড়াই তার নামযই হলোনা। আল্লাহ্‌ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করে পদ্ধতিতে তার এবাদত করার তাওফীক দান করুন। আমীন! 

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন প্লিজ!

والله سبحانه وتعالى أعلم

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ