Subscribe Us

header ads

অন্ধ বা এক চোখে দেখেনা এমন ইমামের পিছনে নামায আদায় করার বিধান।

প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম। আমি একজন মুফতি সাহেব। একটা মসজিদে ইমাম নিয়োগের পরীক্ষায় আমি ১ম স্থান অর্জন করেছি। মসজিদ কমিটি তাদের শর্ত সাপেক্ষে নিয়োগের ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, আমি তাদের বলেছি যে আমি ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী।    

কিন্তু সমস্যা হলো, কিছু মানুষ আমার নামে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তিকর ফতোয়া ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে যে, আমার ইমামতি মাকরুহ হবে। কারণ আমার এক চোখে সমস্যা আছে। (সমস্যা হলো আনুমানিক ৩ বছর বয়সে একটি এক্সিডেন্টে আমার ডান চোখ নষ্ট হয়ে যায় এবং আমি সেটাতে কিছুই দেখিনা। তবে অন্য চোখ সম্পুর্ণ ভালো আছে, আলহামদুলিল্লাহ) ভাল এক চোখ দিয়ে জীবনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত লেখাপড়া সহ বিভিন্ন মসজিদে পেশ ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করে আসছি।

জামিয়ার ফতোয়া বিভাগের নিকট আমার প্রশ্ন হলো:- আমার ইমামতি মাকরুহ হবে কিনা?

 

সমাধান: ইমামতির সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি হলেন, যিনি কুরআন-হাদীস সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী তথা আলেম। এই ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:-

يَؤمُّ القومَ أقرئهم لكتابِ اللهِ، فإن كانوا في القراءةِ سواء فأعلمهم بالسنة فإن كانو في السنة سواء فأقدمهم هجرة، فإن كانوا في الهجرة سواء فأقدمهم سلما، ولا يؤَمَّنَّ الرجلُ الرجلَ في سلطانه، و لا يقعد في بيته على تكرمته إلا بإذنه (مسلم)

অর্থ: মানুষদের ইমামতী করবে ঐ ব্যক্তি যে তাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী ও সুন্দর পাঠকারী। যদি তারা পাঠ করার ক্ষেত্রে সমমানের হয়, তাহলে তাদের মধ্যে যে হাদীস ও সুন্নাহের অধিক জ্ঞানী হবে সে ইমামতী করবে। যদি হাদীস ও সুন্নাহের জ্ঞানে সবাই সমান হয়, তাহলে তাদের মধ্যে যে সর্বপ্রথম হিজরতকারী সে ইমামতী করবে। যদি তারা সবাই হিজরতের ক্ষেত্রেও বরাবর হয় তাহলে তাদের মধ্যে প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করেছে সে তাদের ইমামতী করবে। কোন ব্যক্তি যেন কোন ব্যক্তির অধীনস্থ স্থানে তার অনুমতি ছাড়া ইমামতী না করে এবং কোন ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত আসনে যেন তার অনুমতি ব্যতীত না বসে( সহীহ মুসলিম,  অধ্যায়: মাসাজিদ এবং নামাযের স্থান সমূহ, হাদীস: ৬৭৩)  

       

যাদের ইমামতী করা মাকরুহ:- ১। ফাসেকের ইমামতী মাকরুহ। (সুনানে দারাকুতনি : ১৩২৮) ২। বিদআতির ইমামতী মাকরুহ। ( সুনানে ইবনে মাজাহ ৪৯, সুনানে দারাকুতনি ১৭৮৫) ৩আলেমের উপস্থিতিতে ধর্মীয় জ্ঞানহীন ব্যক্তির ইমামতি মাকরুহ। (মুসনাদুল ফিরদাউস ১/৩৯১) ৪অন্ধ ব্যক্তির ইমামতি মাকরুহ। তবে তিনি যদি উপস্থিত সবার মধ্যে উত্তম, বেশি যোগ্য ও জ্ঞানী হন, তাহলে সমস্যা নেই। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা ২/২১৫, সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬২৭)   

ক. হযরত মাহমুদ বিন রবী আনসারী রা. বলেন, 

عَنْ مَحْمُودِ بْنِ الرَّبِيعِ الْأَنْصَارِيِّ أَنَّ عِتْبَانَ بْنَ مَالِكٍ كَانَ يَؤُمُّ قَوْمَهُ وَهُوَ أَعْمَى (صحيح البخارى)

হযরত ইতবান ইবনে মালিক (রা.) তার সম্প্রদায়ের লোকদের ইমামতি করতেন। অথচ তিনি ছিলেন দৃষ্টিহীন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৫৮)  

 

খ. হযরত আনাস রা. বলেন, 

عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَخْلَفَ ابْنَ أُمِّ مَكْتُومٍ يَؤُمُّ النَّاسَ وَهُوَ أَعْمَى (سنن ابى داؤد، كتاب الصلاة، باب إمامة الأعمى)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের ইমামতির জন্য আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম রা.-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন দৃষ্টিহীন। (সুনানে আবু দাঊদ, হাদীস: ৫৯৫)

   

উল্লেখ্য: অন্ধ দুই প্রকার। যথা:- ১-নাপাক (অপবিত্র) থেকে সতর্ক অন্ধ ব্যক্তিতথা পাক-নাপাক সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হবার সাথে সাথে তা থেকে পরিপূর্ণ মুক্ত থাকতে সচেষ্ট। ২-নাপাক বিষয়ে অসতর্ক অন্ধ ব্যক্তি   

ফুক্বাহায়ে কেরাম যেসব অন্ধের ইমামতীকে মাকরুহে তানযীহী বলেছেন, তারা দ্বিতীয় প্রকারের অন্তর্ভূক্ত। অর্থাৎ নাপাক বিষয়ে অসতর্ক অন্ধের ইমামতী করা মাকরুহ। কিন্তু যে অন্ধ নাপাক সম্পর্কে সতর্ক, তথা নাপাক থেকে সর্বদা বেঁচে থাকতে সচেষ্ট এমন অন্ধের ইমামতীতে কোন কারাহাত নেই। মাকরুহ ছাড়াই জায়েয(ফাতাওয়া কাসিমীয়া ৬/৬৫২-৬৫৩) 

আল্লামা ইবনে আবেদীন (রহ.) ফতোয়া শামীতে( قَوْلُهُ وَنَحْوُهُ الْأَعْشَى এর ব্যখ্যায় উল্লেখ করেছেন:-

( قَوْلُهُ وَنَحْوُهُ الْأَعْشَى ) هُوَ سَيِّئُ الْبَصَرِ لَيْلًا وَنَهَارًا... بَحْثًا أَخْذًا مِنْ تَعْلِيلِ الْأَعْمَى بِأَنَّهُ لَا يَتَوَقَّى النَّجَاسَةَ... قَيَّدَ كَرَاهَةَ إمَامَةِ الْأَعْمَى فِي الْمُحِيطِ وَغَيْرِهِ بِأَنْ لَا يَكُونَ أَفْضَلَ الْقَوْمِ ، فَإِنْ كَانَ أَفْضَلَهُمْ فَهُوَ أَوْلَى (رد المحتار ، البحر الرائق)

الْأَعْشَى অন্ধের মতই অর্থাৎ যে রাত-দিন কখনোই চোখে দেখে না, এমন ব্যক্তির ইমামতি করাও মাকরুহ। এমন ব্যক্তিদের ইমামতি করা মাকরুহ হওয়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেহেতু তাঁরা নাপাকি থেকে সতর্ক থাকতে পারেনা।  

তিনি আরও বলেন অন্ধের ইমামতি মাকরুহ যদি সে কওমের মধ্যে আলেম হিসেবে উত্তম ব্যক্তি না হয়আর যদি সে কওমের মধ্যে আলেম হিসেবে উত্তম ব্যক্তি হয় তাহলে তাঁর ইমামতি মাকরুহ নয় বরং উত্তম। (ফতোয়ায়ে শামী ২/৩৫৬, আলবাহরুর রায়েক ১/৬১০)   

আল্লামা ইমাম আলাউদ্দীন আবু বকর কাসানী রহ. ইবনে উম্মে মাকতূমের হাদিসটি (রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকদের ইমামতির জন্য আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম রা.-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন) উল্লেখ করে বলেন, অন্ধ (বিজ্ঞ ও যোগ্য আলেম) এর পিছনে নামায পড়া মাকরুহ হবে না।

ولأن جواز الصلاة متعلق بأداء الأركان وهؤلاء قادرون عليها (بدائع الصنائع)

কারণ নামায সহীহ হওয়ার সম্পর্ক নামাযের আরকানগুলো সঠিকভাবে আদায় করার সাথে। আর তাঁরা এগুলো আদায় করতে সক্ষম। (বাদায়ে ১/৩৮৬)  

উক্ত হাদীসদ্বয় ও ফিক্বহের মাধ্যমে জানা গেল যে, কোন অন্ধ ব্যক্তি যদি যোগ্য ও আলেম হন তাহলে তাঁর ইমামতী মাকরুহ হবে না।      

সুতরাং প্রশ্নকারী মুফতি সাহেবের পিছনে নামায আদায় করা মাকরুহ হবে না। এক চোখ দিয়ে না দেখলে সেই ইমামের পিছনে নামায মাকরুহ হবে এমন কোন দলীল শরীয়তে নেই। আর তিনি তো অন্ধ নয় বরং আল্লাহ্‌ প্রদত্ত এক দুর্ঘটনায় তাঁর এক চক্ষু বিনষ্ট হয়ে যায় তাই তিনি সেই চোখ দিয়ে দেখতে পান নাতবে আল্লাহ্‌ তা’আলার অশেষ করুনা ও অনুগ্রহে তাঁর দ্বিতীয় চোখটি ভাল আছে বিধায় তো তিনি লেখা-পড়া করে হাফেজ, আলেম ও মুফতি হতে পেরেছেন। যারা ফতোয়া দিয়ে বেড়াচ্ছে (উল্লেখিত মুফতি সাহেবের পিছনে নামায আদায় করা মাকরুহ) তাদের কথা ঠিক নয়। তাদের কথা কুরআন-হাদীস ও নির্ভরযোগ্য ফাতওয়ার পরিপন্থী 

والله سبحانه وتعالى أعلم

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য